‘’প্রযুক্তিজ্ঞান ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব’’

লেখক: রালফ রোভার

And upon Allaah let the believers rely. Soorah Al-Ma’idah (5):11 ইসলামপন্থীদের নাস্তিকবিরোধিতা এবং আন্দোলনমুখর হইবার পর হইতেই একটা অপপ্রচার শোনা যাইতেছে যে, ‘’ইসলামিক জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিমাত্রই আনস্মার্ট, ক্ষ্যাত আর প্রযুক্তির কিছুই বুঝেনা।‘’ এখন আমরা দেখিতে চাই যে স্মার্টনেস কি? এবং প্রযুক্তির সহিত ইহার সম্পর্ক কি?

স্মার্টনেসঃ  ‘’সাধারনভাবে স্মার্টনেস বা প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব হইল মানুষের ঐ গুণসমূহের সমষ্টি  যাহা দ্বারা সে যেইকোন কর্ম করিবার ব্যাপারে পরিবেশ বা পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনায় সঠিক সিদ্ধান্ত দ্রুততার সহিত নিতে পারে।‘’ আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে স্মার্টনেসের ইহা হইতে উত্তম কোন সংজ্ঞা দিতে পারি নাই। কোন মহাপুরুষ যদি অন্যরকম কিছু বলিয়া গিয়া থাকেন তো কেহ শুনিয়া থাকিলে জানাইতে পারেন। তাহা ছাড়া কোন ধরনের অপবিশ্বাস কিংবা কুসংস্কার হইতে মুক্ত  থাকাও স্মার্ট লোকের বৈশিষ্ট্য।

প্রযুক্তিজ্ঞানঃ  বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দুনিয়া সৃষ্টির শুরুতে ছিল এবং তাহা সময়ের ব্যবধানে উৎকর্ষতা লাভ করিয়াছে। একসময় চাকা আবিষ্কার ছিল শ্রেষ্ঠতম বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার আর এখন কত কিযে আছে গুনিয়া শেষ করা যাইবে না। এই চলমান উৎকর্ষতায় বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন সভ্যতা,বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর মানুষ ইহাতে অবদান রাখিয়াছে। ইহাতে মুসলিমদের যেমন বড় অবদান,তেমনই অন্য ধর্ম কিংবা বিশ্বাসের অনেক মানুষের অবদান আছে। একজন মুসলিমের বিশ্বাস হইল  জ্ঞান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার দান। জ্ঞান নিয়া গর্ব করিবার যেমন কিছু নাই, তেমনই কোন আবিষ্কারের কপিরাইট কেহ দাবি করিতে পারিবে না।  এক সময়ের সভ্য জাতি দাবি করা গ্রিকগণ জ্ঞানচর্চা শুধুমাত্র রাজপরিবারে সীমাবদ্ধ রাখিয়াছিল।  ফলে ঐ সময়ে জ্ঞানচর্চা অপরাধ ছিল আর অনেক বিজ্ঞানীকে অত্যাচারিত হইতে হইয়াছিল। অথচ ইসলাম এই জ্ঞানচর্চাকে উন্মুক্ত করিয়া দিয়াছিল। রাসুল(সাঃ) মদিনা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরপরই কিছু সাহাবীকে ইয়েমেন পাঠাইয়াছিলেন উন্নত সামরিকবিদ্যা শিখিয়া আসিতে  এবং প্রযুক্তিজ্ঞান আমদানি করিতে।

একজন স্মার্ট লোক তাহার অর্জিত জ্ঞান সঠিক উপায়ে কাজে লাগাইবে ইহাই কাম্য। কিন্তু কেহ যদি সুযোগের অভাবে পর্যাপ্ত প্রযুক্তি জ্ঞান অর্জন করিতে না পারে তবে তাহাকে দোষ দিবার কিছুই নাই। কারণ সুযোগ না পাওয়া কোন অপরাধ নয়। প্রযুক্তি মানুষের কর্মসমূহকে আরও সহজ করিয়া দেয়। কিন্তু মানুষের জীবনব্যবস্থা সর্বযুগে একরকম, ইহা কখনও প্রযুক্তির কারণে পরিবর্তিত হয় না। যেমনঃ ইসলাম আইন তৈরি করিবার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর বলিয়া বিশ্বাস করে, আর গণতন্ত্র মানুষকে আইন তৈরির ক্ষমতা অর্পণ করে। প্রযুক্তির কারণে কোন যুগেই কিন্তু রোবটকে আইন তৈরির ক্ষমতা দেওয়া হইবেনা। ইসলাম নারীদিগকে পর্দায় থাকিয়া সব কাজ করিবার অধিকার দিয়াছে এবং প্রযুক্তির ব্যবহারেও নিষেধ করেনাই। ইহা ছাড়া নারীদিগের নিরাপত্তাও ইসলাম নিশ্চিত করিয়া আসিতেছে। অন্যদিকে বর্তমান ব্যবস্থায় নারীগণ কেবল উলঙ্গ হইবার স্বাধীনতা পাইয়াছে, নিরাপত্তা নহে। প্রযুক্তি এইখানে জীবন পদ্ধতি পরিবর্তন করে নাই, কেবল সহজ করিয়াছে। জাহেলি আরবের সহিত বর্তমান সময়ের মিলসমুহ দেখা যাকঃ

–  ঐ সময়ে নারীদিগকে ভোগের সামগ্রী মনে করা হইত, এখনও  তাহা করা হয়। তবে প্রযুক্তির উন্নতির কারণে তখনকার জলসা ঘরের মত এখনকার নগ্ন নৃত্যের আসর অধিক লোক দেখিতে পায় টি ভি, সিনেমার কল্যাণে।

–  ঐ যুগে কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়া হইত,এখন এবরশন করাইয়া গর্ভেই মারিয়া ফেলে। প্রযুক্তি এখানে মানুষকে উন্নত করে নাই, উল্টা কন্যাদিগের হায়াত আরও কমাইয়া দিয়াছে।

–  ঐ সময়ে এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা হইত, এখনও হয়তবে প্রযুক্তির উন্নতির কারণে বিভিন্ন ডিজিটাল উপায়ে।

–  তখনও মানুষ তন্ত্র মন্ত্র,  ফুল পাখি, পাথরপুঁজা করিত। এখনও করে, তবে চেতনার উৎস নাম দিয়া। মঙ্গল প্রদীপের নামে অগ্নিপুঁজার কুসংস্কার আগের দিনের পারসিক মাজৌসিদেরকেও হার মানায়। প্রযুক্তি এইখানে চিন্তাকে উন্নত করিতে পারে নাই।

–  মুদ্রার অংশ কাটিয়া মুদ্রাস্ফীতি ঘটানো হইত প্রাচীনমিশর ও তাহার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে। এখনও একিভাবে মুদ্রাস্ফীতি ঘটানো হয় তবে অন্য উপায়ে। কি সুন্দর নাম দেয় inflation,credit crunch। পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থায় অর্থনৈতিক পতন প্রযুক্তি ঠেকাইয়া রাখিতে পারে নাই।

–  জাহেল অসভ্য গ্রিকদের মত জ্ঞানচর্চা কিংবা বিজ্ঞানচর্চা করিবার সুবিধা কেবল সামর্থ্যবানেরাই পায়। আবার প্যাটেন্ট, কপিরাইট আইনের মাধ্যমে আবিষ্কারের সুবিধা বিশেষ শ্রেণীর মাঝে সীমিত করিয়া রাখিয়াছে। অথচ ইসলাম ইহাকে উদারভাবে বিতরণ করিয়াছে। বাগদাদের বাইতুল হিকমাহ কিংবা স্পেনের কর্ডোভাতে  খ্রিস্টানরা বিনামুল্যে জ্ঞানচর্চার সুযোগ পাইত। নিমকহারামগুলা সব ভুলিয়া গিয়াছে।

মানুষের প্রবৃত্তি,চাহিদা সর্বযুগে একিরকম। শুধু তাহা পুরন করিবার পদ্ধতিকে একটু সহজ করিয়া দেয় প্রযুক্তি।মানুষের গুণাবলীর গুণগত পরিবর্তন এই প্রযুক্তি আনিতে পারে না। রুচিহীন,  কুসংস্কারচ্ছন্ন মানুষ অনলাইনে আসিয়া চটি লেখিবে, পর্ণ দেখিবে,  গালাগালির তুবড়ি ছুটাইবে। প্রযুক্তি ইহাদের রুচির পরিবর্তন করিতে পারে না। আগেকার দিনের কাপড় খুলিয়া পাথরপুঁজা করা মানুষগুলার উত্তরসূরিরা এখন মিডিয়া সহকারে নৃত্য করিয়া মোম জ্বালাইয়া পাথর পুঁজা করে।

মধ্য যুগের ইউরোপিয়ানরা বিশ্বাস করিত যে, ইউরোপের পর আর দুনিয়া নাই।  একটা বিশাল গর্ত আছে যাহাতে পরিয়া যাইবে। ঐ সময় তাহারা চরম কুসংস্কারে ছিল। মুসলিমরাই তাহাদের সভ্যতা শিখাইয়াছিল। অথচ আমাদের শিখানো হইতেছে ইসলাম পালন করিলে মধ্যযুগে ফিরিয়া যাইব। অবশ্যই আমরা ঐ যুগে যাইতে চাই, তবে ঐ ইউরোপে না এশিয়াসহ বাকি সভ্য অঞ্চলে। কিন্তু তোমরা যাহা করিতেছ তাহাতে মধ্যযুগের ইউরোপেই ফিরিয়াযাইবে। আজকে বিভিন্ন মাথাচেলা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিগন কহিতেছে ইসলামী শাসন ব্যবস্থা তাহাদের বর্বর যুগে নিয়া যাইবে। মূলত এখন আমরা বর্বর যুগেই আছি। ইসলাম যেইখানে নিয়া যাইবে সেইখানে আমরা ইউরোপ জয় করিব ইনশাল্লাহ।

আজকে পর্যাপ্ত সুযোগ না পাইয়া কওমি মাদ্রাসা পড়ুয়াগণ প্রযুক্তিজ্ঞান পাইতেছে কম। কিন্তু তাহাদের ঐ সুযোগ দেওয়া হইলে অন্তত চটি না লিখিয়া কোরআন, হাদিসচর্চা করিবে। তাহাদের ভিতর তোমাদের মত কুসংস্কার নাই, ভণ্ডামিও নাই। কিছুদিন পৌত্তলিকতা চর্চা করিয়া পাথরপুজা আবার বিপদে পড়িলে কোরআনের বাণী দিয়া আশ্রয়প্রার্থনা করার মত ছলনা এই মানুষগুলা করিবে না। ইহারা তোমাদের তুলনায় বহুগুনে স্মার্ট। কারণ তাহারা চিন্তা হইতে উৎসারিত আদর্শের জন্য সংগ্রাম করিতে গিয়া জীবন দিতেও পিছপা হইবেনা। তোমাদের মত ভাষা আর ভূখণ্ড নিয়া আবেগী  আন্দোলন করিতেছে না।

আমাদের দরকার পরিপূর্ণ ইসলামী আকিদা হইতে উৎসারিত স্মার্ট চিন্তা যাহা কুফরকে সার্থকভাবে  মুকাবিলা করিবে। কুফরের কাছে দাবিদাওয়া নিয়া  অরণ্যে রোদন করিবে না। তবেই আমরা এই সমস্ত কুসংস্কারাচ্ছন্ন, বর্বর, মধ্যযুগীয় ইউরোপিয়ান আদর্শের উচ্ছিষ্ট, আমাজন জঙ্গলের নৃত্যরত পাথরপুঁজারী জংলীগণের উত্তরসূরি, সভ্যতার কলঙ্ক, উত্তম পোশাক ছাড়িয়া ছাল বাকল পরিধান করা প্রস্তর যুগের অনুসারী এইসব মুক্তমনাদের উচিত শিক্ষা দিতে পারিব।

আমাদের অবশ্যই সেই মহান আদর্শের দিকে ফিরিয়া যাইতে হইবে যাহা ৫ হাজার বছর পুরানো গ্রিক অসভ্যতা হইতে উৎসারিত, পচন ধরা গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদকে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে ছুড়িয়া ফেলিবে। ইনশাল্লাহ সেইদিন আমরা যেমন অসহায় মানবতার নিরাপত্তা, অন্ন, বস্র, বাসস্থান আর শিক্ষার ব্যবস্থা করিব, তেমনই এই অসভ্য নগ্ন নারীপুরুষগুলার দিকে কাপড় লইয়া ছুটিয়া যাইব তাহাদের ইজ্জত ঢাকিতে। কারণ ইসলাম বিশ্বাসী অবিশ্বাসী সকলের ইজ্জতের হেফাজত করে। এবং ইসলাম আবারও এই দুনিয়াকে উপহার দিবে এক কুসংস্কারমুক্ত, অভাবমুক্ত, অশ্লীলতামুক্ত এক উন্নত  সভ্যতা যেইখানে মহান প্রতিপালকের প্রশংসাধ্বনি উচ্চারিত হইবে প্রতিটি জনপদে, অশ্লীল নৃত্যগীত নহে। আসুন আমরা ছুটিয়া যাই মহান প্রতিপালক আল্লাহর ক্ষমা ও পবিত্রতার দিকে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদিগকে ক্ষমা করুন এবং তৌফিক দান করুন উনার প্রদত্ত জীবন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করিবার। আমিন

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s