আমি আল্লাহতায়ালাকে কেন ভালবাসি ?

লেখক: সাদিক উল্লাহ

আমি তাকে (আল্লাহতায়ালাকে) কেন ভালবাসি ?বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

আসসালামুআলাইকুম ওয়া বারকাতুহু

আমার পরিচিত অনেকেই প্রায়ই জিগ্যেস করে “আপনি/তুমি তো আগে এমন ছিলে না, কি/কে  তোমাকে এমন পরিবর্তন করেছে ? আমি কখনোই তাদের কোনো জবাব দেইনি । জীবনে আজ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা, আল্লাহতায়ালার আমার প্রতি অশেষ অবদানের ঘটনাই মূলত এর কারণ, আজ সেই অশেষ অবদানের ঘটনাই  জানাবো ।

কিন্ত কোনো এক অজানা তাড়নায়, মনে হলো গোপন কথাটি জানিয়ে দেই ।

১. খুব ছোট্টকালে, এক প্রচন্ড ঝড়ের সময় ‘হারিকেন” ভেঙ্গে কাঁচের টুকরো আমার চোখে ঢুকে যায়, আল্লাহর অশেষ রহমতে চোখের অপারেশন ভালো ভাবেই শেষ হয়, যদিও ক্লাস ৫ থেকে নিয়মিত চশমা পরছি, বয়সের কারণে চশমার পাওয়ার বদলানো ছাড়া মারাত্বক কিছু হয় নি !

২. আমার স্কুল যাওয়ার বয়স থেকে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন পর্যন্ত, আমি হর হামেশাই, নানা রকম অসুখে ভুগতাম,আর মৃত আম্মা আর আব্বা ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা করানো  ছাড়াও, আমাকে ছোট বড় নানা সাইজের তাবিজ পরাতেন, কিন্ত কেন জানি না আমার তাবিজ পরতে ভালো লাগতো না । তাবিজ বেশীর ভাগ সময় আমার পকেটেই থাকতো । আমি একবার চতুর্থ শ্রেনীর বার্ষিক ইংরেজী পরীক্ষার সময়, অজ্ঞান হয়ে যাই, যার কারনে, আমাকে জরুরী ভিত্তিতে “মিটফোর্ড হাসপাতালে” ভর্তি হোতে হয়েছিল, ইনজেকশন আর সেলাইন দেয়ার পর বাড়ীতে আসি, বাকী পরীক্ষা গুলো অসুস্থ অবস্হায় শেষ করি । সবচেয়ে আশ্চর্যের ঘটনা হচেছ,  সেই ইংরেজী পরীক্ষাতে আমি ৯২ পেয়েছিলাম, আর বার্ষিক পরীক্ষাতে, আমার শাখাতে ১ম হওয়া ছাড়াও সম্মিলিত মেধা তালিকায় আমি হলাম ৩য় ।

৩.  যদিও আমি এখন একজন রীতিমতো বড় টাক মাথার (বিশাল স্টেডিয়াম) অধিকারী, তবে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন পর্যন্ত, আমার মাথার চুল বেশীর ভাগ সময়ই কাঁধ পর্যন্ত ছিলো. তবে চুলে তেল দেবার কোনো প্রয়োজন মনে করিনি, মাথায় প্রায় “উকুন” নামক কীট দুর্দান্ত প্রতাপে ঘুরাফেরা করতো ! তাই, একবার আমার সপ্তম শ্রেনীর অর্ধ বার্ষিকী পরীক্ষার সময়, আমার মা, আমার বড় বোনকে আমার মাথা ঠান্ডা রাখার জন্য তেল দিতে বলেন, আর আমিও বাধ্য  ছেলের মতো তেল দিলাম! আর যা হবার তাই হলো, মাথা ঘুরে পড়ে থাকলাম আর পরের দিনের পরীক্ষার কোনো প্রস্তুতিই নিতে পারলাম না! খুব দুর্বল অবস্থায়, সমাজ বিজ্ঞান পরীক্ষা দেবার জন্য পরীক্ষা হলে ঢুকলাম,  পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পাওয়ার পর, যথারীতি পরীক্ষা দেয়া শুরু করলাম, কিছুই তো পড়িনি, কি পরীক্ষা দিবো ? কিছুক্ষন, প্রশ্নপত্র হাতে নিয়ে বসে থাকলাম ! আর মনে মনে “রাব্বি জিদনী ইলমান” পড়তে থাকলাম, কিছুক্ষন পরে, মনে হলো কে যেনো পাশে দাড়িয়ে আমাকে উত্তর বলে দিচ্ছে আর আমি লিখে যাচ্ছি ! যদিও সেই  অর্ধ বার্ষিকী পরীক্ষায়, মেধা তালিকায়, ১ম পাঁচ জনের মধ্যে থাকতে পারিনি, তবে, সমাজ বিজ্ঞান পরীক্ষায় যৌথ ভাবে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছিলাম ।

৪. অনেক দেরী হলেও বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই আমি নিয়মিত ভাবে মসজিদে নামাজ আদায় ও রোজা রাখা শুরু করি । মাস্টার্স পরীক্ষা শেষে, ইন্টার্নীর শেষ পর্যায়ে, আমার খুব জন্ডিস হয়েছিলো, কোনো কোনো দিন, এতো শরীর খারাপ থাকতো যে, ওয়াক্তের নামাজ বিছানায় শুয়ে শুয়ে পড়েছি কিংবা কাজা পড়েছি. যখন প্রায় তিন সপ্তাহ হয়ে গিয়েছে, জন্ডিস কমছে না, তখন আল্লাহর কাছে দুয়া করলাম “আল্লাহ তোমার জন্যই তো নামাজ আদায় করি, তুমি কি চাও না, যে আমি সুস্হ হয়ে তোমার নামাজ ভালোভাবে  আদায় করি ? সত্যি, কথা বলতে কি সম্ভত, ৭ দিনের মধ্যেই আমি অশেষ রহমতে সুস্থ হলাম । কিনতু, শারীরিক ভাবে খুবই দুর্বল ছিলাম, রমজান মাস তাড়াতাড়ি চলে আসায়, ডাক্তার সাহেব কে, আমার রোজা রাখার ইচ্ছার কথা জানালাম, তিনি জানালেন যে, রোজা রাখলে শরীর আরো খারাপ হোতে পারে । কিন্ত, আমি যথারীতি আল্লাহর নাম নিয়ে, ভালোভাবেই রোজার মাস শেষ করলাম ! ওহ, একটা কথা লিখতে ভুলেই যাচ্ছিলাম, তা হলো, আমি ইন্টার্নীর শেষ করেই আমার প্রথম চাকরী জীবন শুরু করি বাংলাদেশের বিখ্যাত বিজ্ঞাপনী সংস্থা “এডকম লিমিটেডে”

এডকম লিমিটেড, ইস্পাহানী লিমিটেড আর নিউজীলেল্ডর মাল্টিনেশনাল কোম্পানীতে কাজ করতে গিয়ে আমি যে জায়গটা সবচেয়ে পছন্দ করি, সেই মসজিদ, বেশীর ভাগ সময়ই একেবারই হাটার দূরুত্বে পেয়েছি, আর তার যথাযথ সদ্বেবহার করেছি । তবে এই ক্ষেত্রে এডকম লিমিটেডের চেয়ারপার্সন গীতিয়ারা সাফিয়া চৌধুরী আর মেনেজিং ডিরেক্টর নাজিম ফারহান  চৌধুরী, ইস্পাহানী লিমিটেডের চেয়ারম্যান বেহরূজ ইস্পাহানী আর নিউজীলেল্ডর মাল্টিনেশনাল কোম্পানীর (ট্রেইনিং এন্ড টেকনোলজি লিমিটেডের ) রিজিওনাল ডিরেক্টর ডা: জাভেদ আনওয়ারের কাছে আমি চির কৃতজ্ঞ ।

৫. ১৯৯৮ সালে, বিয়ের বেশ কিছু মাস পরে, দার্জিলিঙে এক সুনসান রাত্রে, পথ হারিয়ে ফেলি, বউ তো ভয়ে কাবু আর আয়াতুল কুরসী পড়ছি ! কোথা থেকে দেখলাম, একজন অপরিচিত লোক আসলো আর আমাদের হোটেলের পথ পর্যন্ত আগিয়ে দিলো, সবই বুঝলাম এও আল্লাহরই সাহায্য, এই অভাগার জন্য!

৬. ২০০০ সালে, আমার মা যখন গুরুতর অসুস্থ, একবার তাকে নিযে যাছি বারডেমে নাতো শিকদার মেডিক্যাল হাসপাতালে । তাঁর বাইপাস অপারেশন বাংলাদেশের হার্ট সার্জনরা করতে না পারলে, বাধ্য হয়ে ও আল্লাহর উপর ভরসা করে দিল্লীর এপোলো হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম,  ও সেখানে খুব ভালো ভাবেই কোনো ঝামেলা ছাড়া তাঁর বাইপাস অপারেশন করা হয় । সেই সময়, আমার ছোট মামা, আমার খালাতো ভাই ফারুক, আমার বউ আর আমি, কাছে শুধু নামাজ পড়েছি আর দুয়া করেছি.

৭. ২০০৭ সালে যখন আমার ৮ বছরের মেয়েকে আর বউকে নিয়ে, উমরাহ ও হজ্জ, করার সিদ্ধান্ত নেই, তখন আমার সর্বসাকুল্যে আনুমানিক, ৭.৫ লক্ষ টাকা ছিলো । তখন নিজের ও অসুস্হ মায়ের জন্য একটা পারবারিক গাড়ীর বিশেষ প্রয়োজন থাকা সত্বেও, যেহেতু  ইসলামী আইন অনুযায়ী হজ্জ ফরজ হয়ে গিয়েছিলো, তখন  উমরাহ ও হজ্জ, করারই  সিদ্ধান্ত নেই, আগে পিছে না ভেবে । এই সময় আমি আমার বিভিন্ন সুদ থেকে উপার্জিত আনুমানিক ২.৫ লক্ষ গরীব মানুষের মাঝে বিলিয়ে দেই ।

উমরাহ ও হজ্জ করার আগে আমি বেশ অসুস্থ্য ছিলাম, কিনতু আশ্চর্য হলেও সত্যি যে, আরব দেশে ৪২ দিনের অবস্থান কালে, আমার কোনো মারাত্মক শরীর খারাপ হয়নি । একবার আমার মেয়েকে নিয়ে কাবা শরীফের মূল চত্বরে, তওয়াফ করার ৭ চক্করের মধ্যে, ২য় বার তওয়াফ করার সময়, মানুষের চাপে আমার ৮ বছরের মেয়ে আর আমি এবং বউ ক্ল়ান্ত্ব হয়ে পড়লে, আমি তাদেরকে  নিয়ে ২য় তলায় নিয়ে, বাকী ৫ বার  তওয়াফ করার জন্য আল্লাহর কাছে শক্তি কামনা করি আর বাকি সব কিছু যেনো সহজে আদায় করতে পারি তার জন্য দুয়া করি ।  যারা  কাবা শরীফের  মূল চত্বরে তওয়াফ করেছেন, তারা জানেন যে, মূল চত্বর থেকে ২য় বা ৩য় তলায় তওয়াফ করতে কিছুটা সময় লাগে, কিন্ত আমার মনে হলো যে, আমাকে আল্লাহ যেমন অতিরিক্ত শক্তি দিলেন আর সমস্ত শরীর মাটি থেকে শুন্যে ভেসে উঠে গিয়ে উড়িয়ে নিয়ে পাখীর গতিতে বাকী ৫ বার  তওয়াফ, সুস্থ ভাবে শেষ করি ।

৮. উমরাহ ও হজ্জ করার মাস কয়েক আগে, কোম্পানী থেকে সাধারণ গণ বোনাস পেয়েছিলাম আর হজ্জ করে ফিরে এসে প্রথম কাজের দিনই বিশেষ বোনাস পাই !

৯. আল্লাহ আমার জীবনধারা  আরো পরিবর্তন করে দেন, কিছু মানুষের সাহায্যে, তাঁদের থেকে এখনো অনেক শিখছি, তাদের মধ্যে আমার মামতো ভাই, আমার ফেসবুক বন্ধু শরীফ আবুল হায়াত, নাহিয়ান, রাইক রিদওয়ান, গাজী আরমান, মীর সাজ্জাদ, খালেদ লতিফ ও আরো অনেকে.

আরো অনেক অসংখ্য ঘটনা আছে যা, এখন বয়সের কারনে মনে করতে পারছি না.

ধার্মিক বলতে যা বোঝায় কোনো কালেও তা, আমি নিজেকে কখোনই মনে করি না, বরঞ্চ, অন্যান্য আশেপাশের মানুষদের আমি বেশী ধর্মভীরু মনে করি ।

ছোট্ট ছোট্ট এ সব কিছু ঘটনা, আপনাদের সাথে শেয়ার করার উদ্দেশ্য হছে আল্লাহ কে ভালোবাসা, ভয় করা ও রাসুলের জীবন অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা, যাতে করে দুনিয়ার ও পরকালে সবার  জীবন সুন্দর হয় । বিপদের দিনেও  যেমন আল্লাহ কে ডাকতে হয় তেমনি সুখের দিনেও ।

জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত রাশি রাশি আল্লাহর নিয়ামত আমরা ভোগ করি, কিনতু ছোট্ট শুকরিয়া বা ছোট্ট ধন্যবাদ জানাই না । যারা কর্মজীবী তারা বেশীর ভাগ সময় তাঁর “বস” এর কল/ডাক আসলে যেখানেই থাকুক না কেন, তার ডাকে সাড়া দেন, কিনতু যিনি  সমস্ত মাখলুকাত, বেহেশত আর দোজখের মালিক, যাঁর, উপরই মানুষের, ভাগ্য নির্ভর করছে, তার দৈনিক ৫ বার নামাজের ডাকে সাড়া না দিয়ে, পৃথিবীর ধোকায় পড়ে থাকি, কতোই না আমরা দিন দিন আরো বেশী বোকার মতো কাজ করে যাছি ।

তাই আসুন, সবাই, মিলে দুয়া করি “ হে আমাদের মালিক, যদি আমরা কিছু ভুলে যাই, কোথাও যদি আমরা কোনো ভুল করে বসি, তার জন্য তুমি আমাদের পাকড়াও করো না, হে আমাদের মালিক, আমাদের পূর্ববর্তী (জাতিদের) ওপর যে ধরনের বোঝা তুমি চাপিয়েছিলএ,  তা আমাদের উপর চাপিও না । হে আমাদের মালিক, যে বোঝা বইবার সামর্থ্য আমাদের নেই, তা তুমি আমাদের উপর চাপিয়ে দিও না, তুমি আমাদের ওপর মেহেরবানী করো । তুমি আমাদের মাফ করে দাও । তুমিই, একমাত্র আশ্রয়দাতা বন্ধু, অতএব, অবিশ্বাসকারী মোকাবেলায় তুমি আমাদের সাহায্য করো । “ সুরাহ: আল-বাকারা আয়াত : ২৮৬

Leave a comment